করোনা, লকডাউন ও গ্রাম বরাকের ছবি –৩

by

সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

জীবনকে ছন্দে ফেরানোর চেষ্টায়। নিজের ঘর মেরামতির উদ্যোগ। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

জীবনকে ছন্দে ফেরানোর চেষ্টায়। নিজের ঘর মেরামতির উদ্যোগ। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

মৃত্যুর স্রোতস্বিনীর ভয়ে জীবনের চাকা কতদিন থামিয়ে রাখা যায়! জীবন থেমে গেলেই তো মৃত্যু আসে সেই গতির ধারবাহিকতা বজায় রাখতে। তাই সেই নদীর ভয়ঙ্কর স্রোত উপেক্ষা করেও সেতু নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু যখন প্লাবন আসে আমদের ঘরেও সেই স্রোত আর ঢেউ জোর ধাক্কা দিয়ে যায়। তখন সেতু নির্মাণের কথা কেউ ভাবতেও পারে না। সে চলে যাওয়ার সময় ছেড়ে যায় নোংরা কাদা আর আবর্জনার রাশি। সেই সব পরিষ্কার করে তবেই বাস্তুকারের মাথায় আসে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা। করোনার হানা পৃথিবীময় মহাপ্লাবনের মতোই; অনেকটা নুহ নবীর সময়কার প্লাবনের মতোই পৃথিবীময়।

কাদা আর আবর্জনার মধ্যেই আবার শুরু হয়েছে চলাচল। কিন্তু ধীর লয়ে। কিস্তি কিস্তি করে জীবনের পাপড়ি উন্মোচিত হচ্ছে। একটুকুন ছড়িয়ে দিলেই কোথা থেকে এসে ঝাপটা মেরে বসবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু। এই তো আশেপাশেই সে ঘাপটি মেরে বসে আছে। তাই সাবধান; সাবধানের মার নেই। চিকিৎসা, অত্যাবশ্যক পণ্য, প্রশাসন ইত্যাদির সাথে এবার আংশিক মুক্ত হলো খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রয় ব্যবস্থা, নির্মাণ, লরি মেরামত ইত্যাদি। সরকারি কার্যালয়ে পালা করে হাজিরা দেবেন কর্মচারীরা। জমায়েত বন্ধ থাকবে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্নই থাকবে আরো বহুদিন।

আমাদের জীবন তো শহরমুখী হয়ে গেছিল। হঠাৎ করে সেই পথ বন্ধ হয়ে গেল। যাত্রীবাহী গাড়ি চালিয়ে যারা রোজগার করত তারা এখন আমাদের চোখের সামনেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। এরকম আরও অনেক কর্মক্ষেত্র অচল হয়ে পড়ছে। এদের জন্য জন্য বিকল্প কী? বরাক উপত্যকায় সেই অর্থে কৃষি নেই। এখানে সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে না চাষির পেঠ ভরে না জমি মালিকের। ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যাওয়া কৃষিজমির মালিকরা এখন আর জমিদার নন। সরকারি উন্নয়ন কাগজে আর রাঘব বোয়ালদের পেটে। কোটি টাকার জলসিঞ্চন প্রকল্প থেকে দুই ফোঁটা জলের ছিটেও বের হয়না। মানুষের অনৈতিক দাবি মেটাতে টিলাগুলোর দেহ বিসর্জন হয়েছে জলাশয়ে। আর জলাশয় ভরে ঘর উঠেছে। তাই খাদ্য উৎপাদনের সব রাস্তাই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এদিকে প্রায় শূন্যহাতে ঘরে ফিরছে হায়দরাবাদ, বাঙ্গালোর, কাতার, দুবাই থেকে কাতারে কাতারে যুবকের দল। তাদের নিয়োগকারী উদ্যোগপতিদের অনেকেই এই বাড়তি বোঝা নানা অজুহাতে ঝেড়ে ফেলতে চাইছিল, এখন সে পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। কম শ্রমিক দিয়ে বেশি মুনাফা অর্জনের চেষ্টাই করবে তারা। আসলে এদের তো কোনও লোকসান নেই, উদ্বৃত্ত মুনাফায় ঘাটতি হবে মাত্র। এই সুযোগে কোটি কোটি টাকার কর মকুব করার ধান্ধা করবে এরা। ফলে সস্তা শ্রমিকের ছড়াছড়ি হবে বিশ্বময়। আমাদের বরাকেও এর ঢেউ আছড়ে পড়বে।

WhatsApp Image 2020-04-21 at 11.26.54 AM

হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স করে সুরাট গিয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মুন বড়ভূইয়ার। এখন তো আর বসে থাকতে পারে না সে। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে আবার সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু প্রয়োজন সব পারে। সময় বলে দেবে ঠিকই; কিন্তু সে অপেক্ষা না করে সময় থাকতে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষি, জলসেচ ইত্যদি বিভাগের যা গেছে তা নিয়ে আন্দোলন করার সময় এখন নয়। কিন্তু যা অবশিষ্ট আছে তা নিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় সেই পন্থা ঠিক করতে হবে। এসব বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এখন কাগজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাঠে নামতে হবে। বর্ষার মরশুমে ধান সহ অন্যান্য শাকসব্জি কীভাবে ফলানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের নামে রাস্তা নির্মাণ আর নয়। বরং যেখানে বাঁধ দরকার সেখানেই তা নির্মাণ করতে হবে। জবরদখল হওয়া জলাশয় মুক্ত করে মৎস্যচাষের উপযোগী করে তুলতে হবে। জল নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে এমজিএনরেগার মাধ্যমে।

যারা কৃষির সঙ্গে মোটেই পরিচিত নয় তারা এখন এক বিপন্ন প্রজাতির মত। এদের কথা আলাদা করে ভাবতে হবে। স্বল্পকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে এদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা করার সুযোগ করে দিতে হবে। এছাড়াও এদের বড় অংশ যেহেতু শিক্ষিত তাই তাদের দক্ষ শ্রমিক, উদ্যোগী বা ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।


সাদিক মোহাম্মদ লস্কর বরাক হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন কমিটির সচিব। তিনি স্কুল পরিচালনা ও সাংবাদিকতার কাজেও জড়িত।

Tags: , , , , , , , , ,


%d bloggers like this: