Archive for the ‘বাংলা’ Category

করোনা, লক ডাউন ও গ্রাম বরাকের ছবি– ৪

May 6, 2020

সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

WhatsApp Image 2020-05-06 at 6.49.44 PM (1)

ম্যাজিক ড্রাইভারস এসোসিয়েশন তহবিল সংগ্রহ করে চালকদের পরিবারের কাছে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছিয়ে দিচ্ছে। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

অনেকটা পাল্টেছে পরিস্থিতি। করোনা যে আমাদের নিত্যশত্রু হয়েও নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবে আরো বহুদিন সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেশে করোনা আক্রান্ত বা মৃতের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়লেও জীবনের চাকা সচল করার চেষ্টা চলছে। এই অসময়ে মানুষের বদান্যতা ও মহানুভবতা ছিল লক্ষ করার মত। অনেক সমালোচনা সত্বেও বলতে হয় এই সময় কিছু সচ্ছল লোক যদি এগিয়ে না আসতেন তাহলে হয়তো উপোস করে মরতে হত অনেক মানুষকে। এখন অনেক নিঃস্ব পরিবার নাকি প্রার্থনা করছে যেন লকডাউন আরো দীর্ঘায়িত হয়। এদিকে পরিবারের মখে দুটি ভাত তুলে দিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে এতদিনে তিলে তিলে গড়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারগুলো। বছর পঁচিশের অবিবাহিত মেয়েদের বা জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারা বছর তিরিশের যুবকদের মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিবারে অশান্তি দেখা দিয়েছে তাদের যারা সঠিকভাবে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার শত চেষ্টার নিগড় ভেঙে বেরিয়ে যাচ্ছে পড়ুয়ারা।

সারা দিন কাজ করে শ’পাঁচেক রোজগার করে ব্যাগ ভরে নিয়ে আসা, বেসরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের শিক্ষাদান, সম্মানের জীবনযাপন এই সব এখন আর সম্ভব নয়। ভাত আছে তো ডাল নেই, তেল নেই। গ্রামের কজন মানুষের মুরোদ আছে রোজ রোজ গাড়ি ভাড়া করার। যাত্রীবাহী গাড়িতে তিনজন যাত্রী নিয়ে সড়কে চলে বিকেলে কি পরিবারের মুখে ভাত দিতে পারবেন চালক? মিস্ত্রিরা এখন কাজ করতে পারেন ঠিকই। কিন্তু কতটুকু? ৬০০ টাকা দরে সিমেন্ট কিনে কজন বাড়ির কাজ করবেন এখন। সরকারি উন্নয়নমুলক কাজ প্রায় বন্ধ। তাও কম মানুষ লাগানোর ফরমান আছে। পান দোকান খুলেছে ঠিকই, কিন্তু দোকানির সদ্য স্পর্শ করা পান কিনে মুখে পুরে নির্ভয়ে চিবিয়ে নেবেন কজন? ক্ষৌরকর্মী এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে পারেন। তা নিছক চুল ছাঁটানোর জন্য ঘরে বিপদ ডেকে আনবেন কজন? পার্লারের মহিলাটি বা ছোকরাটি তার সব আসবাব সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে পারবে? এমন আরো বহু পেশা আছে যা এখন আর ঠিক চলছে না। এই সব মানুষ হাত পাততে পারে না, তাকে দান করতেও কেমন কেমন লাগে।

অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হয়েছেন একেবারে নিঃস্ব পরিবারগুলো। বলছি না যে রাতারাতি ধনী হয়ে গেছেন এরা। কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্না দিয়ে বাড়ি ফিরে আধপেটা থাকতে হচ্ছে না। বরং ত্রাণের ডাল-চাল বিক্রি করতেও পারছেন তারা। আর লাভবান হয়েছেন কৃষক। দুবারের অকাল বন্যায় ভাসিয়ে নেওয়ার পরও নদীর ধারে যারা তৃতীয়বার ফসল ফলিয়েছিলেন তারা লাভবান হয়েছেন। প্রথমটা একটু সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু বাইরের সব্জি না আসায় শেষমেষ অবশিষ্ট ফসল বিক্রি করেই পুষিয়ে নিয়েছেন তারা। ধান চাষ শুরু হতে এখনও বাকি। গালামাল, ওষুধ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবসায়ীদের ফায়দা হয়েছে। তবে এই সব ফায়দা কচুপাতায় জলের মত সাময়িক। মিতব্যয়ী না হলে ঘোর অমাবস্যা অপেক্ষা করছে। নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে উপরের মহলেও।

WhatsApp Image 2020-05-06 at 6.49.44 PM

বাজার শুরু হয়েছে। ক্রেতা বিক্রেতা বাজারে হাজির।  ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

কৃষকদের আবার অনেক রকমফের আছে। যারা শুধু মরশুমে পরের ক্ষেতে চাষ করেন তাদের বছরের ভাত সঞ্চয়ে নেই। শুকনো মরশুমে শহরে বা গ্রামে জোগালির কাজ করে গতর খাটিয়ে পেট চলত তাদের। সব বন্ধ হয়ে গেছে। রেশনের চাল এসেছে, কিন্তু তা থেকেও নাকি এক কিলো করে বাট্টা দিতে হয় ডিলারকে। জিরো অ্যাকাউন্টের টাকা এসেছে ঠিকই। ছোট বাড়িটাতে কিছু সব্জি লাগাতে পারছেন না, কারণ এবারের রাস্তার কাজ করতে গিয়ে নিকাশি নালাটা বন্ধ করে দিয়েছেন মেম্বার। বাড়ির উঠোনে জল থৈ থৈ করবে আর কদিন পর। নদীর ধার ছাড়া বাকি জমিতে শুধু ধানই হয়। তাই যাদের নদীর ধারে জমি নেই তাদের তেল মশলা সব্জি কিনতে টান পড়ছে। সরকারের চোখ রাঙানোকে তুড়ি মেরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে।

দোকান খুলছে এবার, কিন্তু পালা করে। এতদিন পরে দোকান খুলে দেখা গেল কাপড়গুলোতে ইঁদুরের দল দুষ্টুমির কারুকার্য রেখে গেছে। প্রথমটা মাঝে মাঝে শাটার খুলে নাড়াচাড়া করেছিল কাপড় দোকানিরা। কিন্তু একবার খুলতে গিয়ে থানার দালালটা আড়চোখে চেয়েছিল মাত্র। মিনিট পাঁচেক পর দারোগাবাবু দলবল নিয়ে এসে সবার সামনে ঘাড় ধরে নিয়ে গেলেন একজনকে, মা-বোন সহ চোদ্দপুরুষ তুলে বিচ্ছিরি গালিগালাজ দিলেন, লকডাউনের আছিলায় লকআপে পুরে রাখলেন রাতভর, বাড়ির মানুষ এসে দারোগাবাবুকে খুশি করে সকালে তাকে উদ্ধার করলেন। এর পর আর দোকান খোলা হয়নি। এমন অনেক ঘটনা আছে। শাটারের ভিতর নষ্ট হয়েছে ব্যবসায়ীর মূলধন।

টিউশন, ছোটো ব্যবসা, বেসরকারি স্কুল বা বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করে সামান্য টাকা রোজগার করে নিজের পকেট মানি জোগাড় করে অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা। সাফল্যের পরিচিত গলিপথ ছেড়ে কখন স্বপ্নের বন্ধুর পথে পা রেখে হারিয়ে গেছে যারা তারা বাড়ির ঘ্যানঘ্যান থেকে একটু সরে থাকতে চায়। কিন্তু এখন মা-বাবার মুখের বিরক্তি, হতাশা কিংবা অন্যদের উপেক্ষা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে বার বার তার মাথায় এসে আঘাত হানে। ফ্যান, উড়নি আর গলার মধ্যে যেন কী একটা আকর্ষণ সে টের পায়। তবুও এসব সরিয়ে রাখে সে। নিজেকে সে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই প্রবল আকর্ষণ-বিকর্ষণে তার মনটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষের কাছে আছে শিক্ষার দুটি উপায়। এক, সরকারি স্কুলে পাঠাও আর অনায়াসে শূন্য ঝুলি নিয়ে লাফ মেরে এগিয়ে যাও। দুই, বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করো, টাকা খরচ কর আর দুবেলা টিউশনিতে পাঠাও। সন্তানের পাশে দুঘন্টা বসার সময় ছিল না অভিভাবকের। এখন সময় থেকেও নেই। কারণ এ দায়িত্ব তো তাদের নয় বলেই ভাবেন তারা। তাই হোয়াটসআপ, জুম, টিভি, রেডিও কোনকিছুই শিক্ষার সেই ধারাকে ধরে রাখতে পারছে না। সরকারি স্কুলে দশ শতাংশ পড়ুয়া এই সুযোগ নিচ্ছে আর বেসরকারি স্কুলে তার বিপরীত পরিসংখ্যান। কিন্তু এই পড়ুয়ারাও অভিভাবকের আঙুল ছাড়িয়ে ইন্টারনেটের মোহময় বিচিত্র জগতে হাতড়ে বেড়াচ্ছে আর নানা নিষিদ্ধ ফলে হাত পড়ছে তার। ফলে ‘গুড মর্নিং’ ছাড়া আর কিছুই তার তরফ থেকে না পেয়ে হতাশ হয়ে যান শিক্ষক।

ভেবেছিলাম এইবার বোধ হয় নড়েচড়ে বসবে সরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে জোর দেবে। কিন্তু কই? সরকারি স্কুলের অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেসব নির্মাণ কাজ অর্ধসমাপ্ত ছিল সেগুলোও অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটকে রইল। পড়ুয়াদের কষ্ট বেড়েই গেলো। ক্রমশ সংকোচিত হয়ে আসা কর্মসংস্থান হঠাৎ যেন চুপসে গেল। ফলে যুবসমাজের হতাশা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এখন সরকারের উচিত সামরিক বা অন্যান্য কম প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা। কর্পোরেটদের ঋণ মকুব না করে বাড়তি কর চাপানো। রাষ্ট্রসংঘ সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন বলিষ্ট ভুমিকা নিয়ে সীমাসুরক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে আনতেও পারে। সংঘ, সংস্থা ইত্যাদির উচিত সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে বাধ্য করা, অনুদানের অপেক্ষা না করে সম্পদের সদ্ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করা। এক কথায় সর্বস্তরের মানুষকে স্ফটিক স্বচ্ছ মন নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দেওয়ার যে ট্রেন্ড চলছে তাকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে শুধু পয়সা খরচ করলে চলবে না, প্রত্যেককেই নিজ নিজ দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ করতে হবে।


সাদিক মোহাম্মদ লস্কর বরাক হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন কমিটির সচিব। তিনি স্কুল পরিচালনা ও সাংবাদিকতার কাজেও জড়িত।

করোনা, লকডাউন ও গ্রাম বরাকের ছবি –৩

April 21, 2020

সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

জীবনকে ছন্দে ফেরানোর চেষ্টায়। নিজের ঘর মেরামতির উদ্যোগ। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

জীবনকে ছন্দে ফেরানোর চেষ্টায়। নিজের ঘর মেরামতির উদ্যোগ। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

মৃত্যুর স্রোতস্বিনীর ভয়ে জীবনের চাকা কতদিন থামিয়ে রাখা যায়! জীবন থেমে গেলেই তো মৃত্যু আসে সেই গতির ধারবাহিকতা বজায় রাখতে। তাই সেই নদীর ভয়ঙ্কর স্রোত উপেক্ষা করেও সেতু নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু যখন প্লাবন আসে আমদের ঘরেও সেই স্রোত আর ঢেউ জোর ধাক্কা দিয়ে যায়। তখন সেতু নির্মাণের কথা কেউ ভাবতেও পারে না। সে চলে যাওয়ার সময় ছেড়ে যায় নোংরা কাদা আর আবর্জনার রাশি। সেই সব পরিষ্কার করে তবেই বাস্তুকারের মাথায় আসে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা। করোনার হানা পৃথিবীময় মহাপ্লাবনের মতোই; অনেকটা নুহ নবীর সময়কার প্লাবনের মতোই পৃথিবীময়।

কাদা আর আবর্জনার মধ্যেই আবার শুরু হয়েছে চলাচল। কিন্তু ধীর লয়ে। কিস্তি কিস্তি করে জীবনের পাপড়ি উন্মোচিত হচ্ছে। একটুকুন ছড়িয়ে দিলেই কোথা থেকে এসে ঝাপটা মেরে বসবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু। এই তো আশেপাশেই সে ঘাপটি মেরে বসে আছে। তাই সাবধান; সাবধানের মার নেই। চিকিৎসা, অত্যাবশ্যক পণ্য, প্রশাসন ইত্যাদির সাথে এবার আংশিক মুক্ত হলো খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রয় ব্যবস্থা, নির্মাণ, লরি মেরামত ইত্যাদি। সরকারি কার্যালয়ে পালা করে হাজিরা দেবেন কর্মচারীরা। জমায়েত বন্ধ থাকবে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্নই থাকবে আরো বহুদিন।

আমাদের জীবন তো শহরমুখী হয়ে গেছিল। হঠাৎ করে সেই পথ বন্ধ হয়ে গেল। যাত্রীবাহী গাড়ি চালিয়ে যারা রোজগার করত তারা এখন আমাদের চোখের সামনেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। এরকম আরও অনেক কর্মক্ষেত্র অচল হয়ে পড়ছে। এদের জন্য জন্য বিকল্প কী? বরাক উপত্যকায় সেই অর্থে কৃষি নেই। এখানে সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে না চাষির পেঠ ভরে না জমি মালিকের। ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যাওয়া কৃষিজমির মালিকরা এখন আর জমিদার নন। সরকারি উন্নয়ন কাগজে আর রাঘব বোয়ালদের পেটে। কোটি টাকার জলসিঞ্চন প্রকল্প থেকে দুই ফোঁটা জলের ছিটেও বের হয়না। মানুষের অনৈতিক দাবি মেটাতে টিলাগুলোর দেহ বিসর্জন হয়েছে জলাশয়ে। আর জলাশয় ভরে ঘর উঠেছে। তাই খাদ্য উৎপাদনের সব রাস্তাই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এদিকে প্রায় শূন্যহাতে ঘরে ফিরছে হায়দরাবাদ, বাঙ্গালোর, কাতার, দুবাই থেকে কাতারে কাতারে যুবকের দল। তাদের নিয়োগকারী উদ্যোগপতিদের অনেকেই এই বাড়তি বোঝা নানা অজুহাতে ঝেড়ে ফেলতে চাইছিল, এখন সে পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। কম শ্রমিক দিয়ে বেশি মুনাফা অর্জনের চেষ্টাই করবে তারা। আসলে এদের তো কোনও লোকসান নেই, উদ্বৃত্ত মুনাফায় ঘাটতি হবে মাত্র। এই সুযোগে কোটি কোটি টাকার কর মকুব করার ধান্ধা করবে এরা। ফলে সস্তা শ্রমিকের ছড়াছড়ি হবে বিশ্বময়। আমাদের বরাকেও এর ঢেউ আছড়ে পড়বে।

WhatsApp Image 2020-04-21 at 11.26.54 AM

হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স করে সুরাট গিয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মুন বড়ভূইয়ার। এখন তো আর বসে থাকতে পারে না সে। ছবিঃ সাদিক মোহাম্মদ লস্কর।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে আবার সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু প্রয়োজন সব পারে। সময় বলে দেবে ঠিকই; কিন্তু সে অপেক্ষা না করে সময় থাকতে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষি, জলসেচ ইত্যদি বিভাগের যা গেছে তা নিয়ে আন্দোলন করার সময় এখন নয়। কিন্তু যা অবশিষ্ট আছে তা নিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় সেই পন্থা ঠিক করতে হবে। এসব বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এখন কাগজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাঠে নামতে হবে। বর্ষার মরশুমে ধান সহ অন্যান্য শাকসব্জি কীভাবে ফলানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের নামে রাস্তা নির্মাণ আর নয়। বরং যেখানে বাঁধ দরকার সেখানেই তা নির্মাণ করতে হবে। জবরদখল হওয়া জলাশয় মুক্ত করে মৎস্যচাষের উপযোগী করে তুলতে হবে। জল নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে এমজিএনরেগার মাধ্যমে।

যারা কৃষির সঙ্গে মোটেই পরিচিত নয় তারা এখন এক বিপন্ন প্রজাতির মত। এদের কথা আলাদা করে ভাবতে হবে। স্বল্পকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে এদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা করার সুযোগ করে দিতে হবে। এছাড়াও এদের বড় অংশ যেহেতু শিক্ষিত তাই তাদের দক্ষ শ্রমিক, উদ্যোগী বা ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।


সাদিক মোহাম্মদ লস্কর বরাক হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন কমিটির সচিব। তিনি স্কুল পরিচালনা ও সাংবাদিকতার কাজেও জড়িত।

করোনাভাইরাসকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া হচ্ছে আসামে!

April 19, 2020

top-news-eng-17-04-2020

আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সদস্য কমল কুমার গুপ্ত রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে এক চিঠি লিখে বলেছেন যে মার্চের মাঝামাঝি সময় এ রাজ্য থেকে যারা দিল্লির তাবলিগ জামাতের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, তারা ‘জিহাদি’ (অর্থাৎ সন্ত্রাসী), আর এ কারণে তাদের কোভিড-১৯ সংক্রমণের চিকিৎসা করা উচিত নয়।

আসাম ও ভারতের মিডিয়ার একটি অংশ, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ অবাধে ও ক্রমবর্ধমান হারে দায়মুক্তি নিয়েই কোভিড-১৯ মহামারীকে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করছে এবং এর ফলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়ছে।

ভারতের কেন্দ্র ও আসাম রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে।

আসামের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আসামে করোনাভাইরাসের ত্রাণকাজের জন্য ৬০ হাজার রুপি দান করতে চেয়ে যে চিঠি লিখেছেন তাতে কমল কুমার গুপ্তসহ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ডজনখানেক লোকের নাম রয়েছে।

চিঠিতে গুপ্ত লিখেছেন যেন তাবলিগি জামাতের সমাবেশে যোগ দেয়া মুসলিমদের সহায়তা না দেয়া হয়।

তবে চিঠিটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি তার জন্য অস্বস্তিদায়ক হলে তিনি চিঠির সাথে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। আসামে বিদেশী সন্দেহে নাগরিকত্ব হারানো লাখ লাখ লোকের জন্য মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, আইনজীবী কাজ করছেন। নাগরিকত্ব হারানো লাখ লাখ লোকের কাছে গুপ্তের চিঠি ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছে।

আসামের আইন বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, বদ্ধমূল ধারণা পোষণকারী লোকদেরকে নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য গঠিত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সদস্য করা ঠিক নয়।

আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) থেকে ১৯ লাখের বেশি লোকের নাম বাদ পড়েছে। তাদের নাগরিকত্ব ফয়সালার জন্য গঠিত হয়েছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল।

প্রখ্যাত আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আমান ওয়াদুদ বলেন, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তিনি বলেন, চিঠিটি প্রত্যাহার করে নিলেই গোঁড়ামি দূর হয়ে যায় না। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের সহজাত বদ্ধমূল ধারণা এতে প্রকট হয়েছে। তিনি বলেন, গুপ্তের মধ্যে থাকা বদ্ধমূল ধারণা মামলার রায়কে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাকে নাগরিকত্ব মামলায় সম্পৃক্ত রাখা উচিত হবে না।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তদাররিকে দীর্ঘ প্রয়াসের ফলে ২০১৮ সালের আগস্টে আসাম সরকার এনআরসি নামের ওই তালিকা প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে থাকা রাজ্যটির ৩১.১ মিলিয়ন লোকের নাম স্থান পায়। আর বাদ পড়ে ১.৯ মিলিয়ন নাম।

সমালোচকেরা বলছেন, মুসলিমদেরকে কোণঠাসা করা কিংবা বাছাই করার জন্যই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

আসামের ক্যাম্পগুলোতে রাখা লোকদের দুর্দশা নিয়ে গবেষণাকারী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিদ্বেষ উস্কে দিতে মিডিয়া, রাজনীবিদ ও লোকজন একযোগে কাজ করছে। গুপ্তের বিবৃতি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

তিনি বলেন, এসব লোক কোন পদের? তারা ন্যায়বিচার আর সংবিধান সমুন্নত রাখবেন বলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু গুপ্তের মতো পক্ষপাতদুষ্ট লোক কিভাবে ট্রাইব্যুনালে নিরপেক্ষ থাকবেন?

আজাদ সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, আসামে অনেক লোককে স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে বিদেশী ঘোষণা করা হচ্ছে, তারা গুপ্তের মতো লোকদের দয়ার ওপর ভরসা করছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যেই বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছে।

তিনি বলেন, গুপ্তের মতো লোকদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সুয়োমোটো আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অল আসাম মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রধান আজিজুর রহমান বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের মানসিকতা থাকা উচিত নয়। এটি একটি মারাত্মক প্রকাশ্য অবমাননা এবং আমরা এর নিন্দা করি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে সরকার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, তিনি একজন বিচারিক কর্মকর্তা। আমরা এ ধরনের লোকদের কাছ থেকে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতে পারি না। এসব লোককে তাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত।

মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছে, যেসব লোককে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করবে, তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে, তাদেরকে ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে রাখা হবে। বর্তমানে আসামের ছয়টি ডিটেনশন কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি লোক রয়েছে।


এই লেখা প্রথমে সাউথ এশিয়ান মনিটর এ প্রকাশিত হয়েছিল​। আরো বেশি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এখানে আবার প্রকাশ করা হল​।

করোনা, লকডাউন ও গ্রাম বরাকের ছবি –২

April 18, 2020

সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

WhatsApp Image 2020-04-18 at 12.49.43 AM

ক্ষুধার ধর্ম নেই। অ্যাকাউন্টের টাকা দিয়ে খাবার কিনে বাড়ি ফিরছেন ভিন ধর্মী দুই মহিলা। ছবি: সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

লকডাউনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল। না, এখনও জয় করা গেল না এই অদৃশ্য শত্রুকে। তবে মনে হয় একটু দুর্বল হয়েছে। যদি হয়, তবে কারণটা কী তাও জানা গেল না। হয়তো আমাদের অপুষ্টি জর্জর শরীর ততটুকু অপারগ নয়। হয়তো দূষিত জল ও বাতাস সেবন করা এই শরীর দুর্বল জীবাণুকে প্রতিহত করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। হয়তো চারদিকে জমে থাকা আবর্জনার ভিড় আর জীবাণুর আঁতুড়ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে অভ্যাস হয়ে গেছে অনেকের। হয়তো নানা ধরণের টিকা আমাদের শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে রেখেছে। বা হয়তো অন্য কিছু। হয়তো আমরা এইভাবে বয়ে ফিরছি জীবাণুর দল। আর তার জেরে হয়তো ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে এখনও। হঠাৎ করে সব অহঙ্কার ধুলির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে হাহাকার আর আর্তনাদে ভরে যেতে পারে আমাদের চারপাশ। এই পরিস্থিতি যেন কখনও না আসে এই কামনা করি।

কিন্তু আমাদের চাওয়ায় কি সব ঠিক হয়ে যায়? আমরা চাইলেই কি ছেলেগুলো চক্কর মারা ছেড়ে দেবে? আমরা চাইলেই কি অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া ৫০০ টাকা তুলতে মহিলাদের ভিড় এক মিটার দুরত্ব বজায় রাখতে পারবে? আমরা চাইলেই কি মাছ বেচতে আসা লোকটার চারপাশের মানুষগুলোর রাক্ষুসে ভাব উবে যাবে? আমরা চাইলেই কি রেশনের দোকানের সামনের লক্ষণরেখার বাইরে বের হবে না সবজান্তা নির্ভীক লোকটার চরণযুগল? আমরা চাইলেই কি মৃত্যুঞ্জয়ী সংবাদকর্তার মুখ ভয় দেখানো ছেড়ে দেবে? আমরা চাইলেই কি সোশ্যাল মিডিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মহাজ্ঞানী লোকটা কালো দাঁতের ফাঁক দিয়ে দেয়ালে পিক ফেলা বন্ধ করে দেবে? না, হবে না। তাই ভয় হয়। কারণ আমি বা আমার মত অনেকেই জানি না আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটুকু। জানলেও বেপরোয়া হওয়ার সাহস রাখিনা, কারণ আমাদের বাড়িতে শিশু-বৃদ্ধ-অসুস্থ মানুষ আছেন। বাড়িতে না থাকলেও পাশের ঘরে আছেন।

পাঁচশ’ টাকার জন্যে বের হওয়া মহিলার কি মৃত্যুভয় নেই? আলবাৎ আছে। কিন্তু সন্তানের ফ্যাকাশে মুখ চোখের আড়াল করতেই হোক বা আশঙ্কায় টানটান নিজের চেহারাটা সন্তানের চোখের আড়াল করতেই হোক সে বেরিয়ে আসে। মন আনছান করে তার, গণ্ডির ভিতর থেকে তার পা ছিটকে বেরিয়ে আসে কখন সে টেরই পায় না। নির্ভীক লোকটা কি সত্যিই নির্ভীক? সে কি সত্যিই পরমেশ্বরের কাছে তার জীবনের ভার সঁপে দিয়েছে? এমনটা হলে তো সে বসে বসে ঘরের চাল ফেড়ে অন্ন বর্ষণের অপেক্ষায় থাকত। আসলে নিজের অসহায় অবস্থাকে সে নিজেই যেন উপহাস করে। যত্রতত্র পিক-থুথু ফেলা লোকটা কি সত্যিই আত্মবিশ্বাসী? না, ভার্চুয়াল জগতে নিজস্ব পরিসরকেই সে জগত বলে মনে করে। সেই একপেশে জ্ঞান আর বোকা বাক্সে ছড়ানো ঘৃণার জবাবেই সে থুথু ফেলে এখানে ওখানে। আর মাছের ক্রেতা-বিক্রেতা? মদ্রিখালে মাছ ধরতে গিয়ে জলদেবতা এই দুর্যোগে তাকে যে আইড় মাছ উপহার দিলেন তার ক্রেতা প্রত্যন্ত মদ্রিপার গ্রামে নেই, তাই সে বুকের দুরুদুরু চাপা দিতে দিতে বেরিয়ে আসে বড় দরকারি হাজার টাকার লোভে। আর ঠিক তখনই মৎস্যখেকো লোকগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারাও ঘরে আবদ্ধ পরিবারের সদস্যদের চমকে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারে না। বিনা কাজে ব্যাঙ্কে টাকা আসছে, তাই মাছ না খেয়ে মরতে যাবো কেন – এই ভাবনাও কাজ করে কিছুটা। আর দুরন্ত ছোকরাদের কী? চিরদিনই তো তাদের শাসন করতে গিয়ে নিজেদের সেই সময়টা ভুলে যায় বুড়োর দল। তাদের বুকের হাহাকারটা কে বোঝে! তাদের সঙ্গে কি দুমিনিট একান্তে আলাপ করে ঘরের লোক? অবশ্যই না। আর সংবাদ? যে কুকথার বাজার দীর্ঘদিনে গড়ে উঠেছে তা কি ভালো কথায় চলতে শুরু করবে হঠাৎ?

WhatsApp Image 2020-04-18 at 12.49.41 AM

চয়ন পাল শেষ পর্যন্ত কিছু সব্জি কিনে এনে ঘরের বারান্দায় বসে বিক্রি করছেন। ছবি: সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

বাড়িতে অকারণ উৎপাত শুরু করে দিয়েছে শিশুরা। ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যাওয়া বাড়িতে কি আর জায়গা আছে? ঘেন্না ধরে যায় তাদের। সকাল সকাল কাপড় পরে, চুল বেঁধে, পিঠে বইয়ের বোঝা নিয়ে যাওয়াতেও বোধ হয় পরিবর্তনের সুখ ছিল। একমাস হয়ে গেল বন্ধুদের দেখা নেই। ভাই-বোন-মা-বাবাতে সীমাবদ্ধ জীবন আর ভাল্লাগে না। কী হয়ে গেল হঠাৎ! বাবার চোখে চকচকে ভাবটা নেই, হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ঘোলা চোখে। মা যেন আগের মত নেই। সেই দুরত্ব কি সহ্য করা যায়? কবে খুলবে স্কুল, সেই প্রশ্নের জবাব কারো কাছে নেই। বাবা বোধ হয় ভিক্ষেও করে আজকাল – কারা এসে চাল-ডাল দিয়ে যায়, পয়সা নেয় না। এইসব হাজার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না বাচ্চারা। তাই তারা সব গণ্ডি ডিঙিয়ে বেরিয়ে পড়ে খেলার মাঠে। আর যারা পারে না তারা অকারণ উৎপাত করার অপরাধে মার খায় খিটখিটে মেজাজের অভিভাবকদের হাতে।

অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে কিছু স্কুল। এতে পড়ুয়াদের সঙ্গে স্কুলের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না হয়ে এক সূত্র রক্ষা হয়। এসব চলছে হোয়াটসঅ্যাপে নিতান্ত আনকোরা আন্দাজে। বেসরকারি স্কুলের এই উদ্যোগকে অনেকে সন্দেহের নজরে দেখছেন। অনেক অভিভাভক কর্মহীন হয়ে মোবাইলটি নিয়ে একটু ডুবে থাকবেন ভাবছেন, তো শিশুটি এসে সেই মোবাইলটি চেয়ে বসে, আর তখনই মেজাজ হারিয়ে বসেন অভিভাবক। শিক্ষকদের ভয়েস নোট পাঠিয়ে কড়া বার্তাও দেন অনেকে। অনেক বেসরকারি স্কুল সে চেষ্টাও করেনি। মন্দার বাজারে বেসরকারি স্কুলগুলো বেতন দেবে কী করে সেও এক সমস্যা। তাই অনলাইন ক্লাসের ঝামেলা বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেকেই। সরকারি বিদ্যালয়ের চিত্র অন্যরকম। স্কুল খোলা থাকলেও যেখানে শিক্ষা দান বা গ্রহণে কোনও পক্ষেরই কোনও আগ্রহ থাকে না, সেখানে স্কুল বন্ধ থাকা অবস্থায় এই অখণ্ড অবসর বিনোদনের সুযোগ কে হাতছাড়া করে! ফলে সরকারের নির্দেশ যেমন দায়সারা, তেমনি শিক্ষকরাও যেনতেন প্রকারে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিতেই ব্যস্ত। পরিচালন সমিতি তো এসব বোঝেই না। যারা বোঝে তাদের হাতে তথ্য নেই। অ্যাডমিশন রেজিষ্টার নেই স্কুলে, থাকলেও সেখানে কোনও বর্ণনা নেই। আর অভিভাভক তো আর এসব সাত পাঁচে নেই। স্মার্ট ফোনই বা কজনের ঘরে আছে? সব গ্রামে ইন্টারনেট পরিষেবাও পৌঁছায়নি। তাই পড়াশোনা যে লাটে উঠেছে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সব কিছু ছন্দে ফিরতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

সুখের শিখরে বসে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা লোকগুলো মাটির খবর রাখে না। তারা ভাবে টাকা দিলাম, খাবার দিলাম, তার পরও ঘরে বসে থাকে না মূর্খের দল। পাঁচশ টাকায় কদিন যায়? শুধু কি খাবার? করোনা ছাড়া আর সব রোগ কি ত্রিভুবন ছেড়ে পালিয়ে গেছে? ওষুধ চাই, ঘর মেরামতের খরচ চাই, বস্ত্র চাই, মোবাইল রিচার্জ চাই, বই-খাতা চাই। পাঁচটা আলু, দুশ গ্রাম তেল, দু কিলো চাল, এক পোয়া ডাল দিয়ে ফটো তুলে যারা প্রচার করেন তারা বোঝেন না যে এই সামগ্রি দুবেলার ক্ষুধার যোগান নয়। এটা শেষ হওয়ার পরেই শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। কারণ খাদ্যদ্রব্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া। সরকার এসব নিয়ন্ত্রণে অপারগ।

WhatsApp Image 2020-04-18 at 12.49.42 AM

নিজের কাজ নেই। অভিজিৎ দেব বাবার পুরনো দোকানে আবার পসরা সাজানোর চেষ্টায়। শহর থেকে চড়া দামে পণ্য কেনা আর আনা বড়ো কঠিন। ছবি: সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

অনেকেই দেখেন অসহায় মানুষকে। অসহায় মানে বিধবা মহিলা, রুগ্ন-অক্ষম লোক, ভিক্ষাবৃত্তির উপর নির্ভরশীল পরিবার ইত্যাদি। কিন্তু এখন একটা নতুন শ্রেণী অসহায় শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। যাত্রীবাহী গাড়ির চালক, পান দোকানি, পুচকাওয়ালা, দোকানের কর্মচারি, রাজমিস্ত্রি – এদের চুলার খবর কে রাখে। লাইনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে নিতে পারে না তারা। তাই এঘর ওঘর করে বেড়ায়। আগে জানলে হয়তো অন্য উপায় করে রাখত। প্রথমে হিমালয় পাহাড়ের আড়ালে, তারপর সাগরের ওপারে ছিল মানুষের দুঃখ। তাই দেখা গেল না, আর কেউ সতর্ক করেও দেয়নি।

এখন হবে কী? তাসের ঘরের মত নিচের তলা থেকে ধীরে ধীরে ধসে পড়বে আমাদের অর্থব্যবস্থা। অনেক কিছুই আর আগের মতো ফিরে আসতে পারবে না। বহুদিন রাস্তায় চলবে না যাত্রীবাহী গাড়ি। মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হয়ে পড়বে। ঘৃণা এই আছিলায় ছড়িয়ে পড়বে গ্রামে গঞ্জে। বহু মানুষ একঘরে হয়ে যাবেন সতর্কতার অজুহাতে। অস্পৃশ্যতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এই সব কিছুর জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে সবাইকে। সরকার মানুষের কথা ভাবে না। তার ভিতর চলে রাজনীতির নানা জটিল অঙ্ক। তাই সচেতন মানুষকেই এ নিয়ে ভাবতে হবে, পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। গণ হিস্টিরিয়া থেকে কীভাবে সমাজকে বাঁচাতে হবে তা ঠিক করতে হবে। নতুবা উন্মাদের দেশে পাগলা গারদের মতো বাস করতে হবে। এই বিপদে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আশা করা যায় না।


সাদিক মোহাম্মদ লস্কর বরাক হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন কমিটির কার্যকরী সদস্য।

করোনা, লকডাউন ও গ্রাম বরাকের ছবি –০১

April 18, 2020

সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

WhatsApp Image 2020-04-18 at 7.12.40 AM

প্রত্যন্ত এলাকায় ইঁট ভাটির মালিকের দেওয়া ত্রাণসামগ্রী নিতে শ্রমিকদের ভিড়। ছবি: সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

চিনের উহান থেকে যে অদৃশ্য শত্রু মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করার দুরভিসন্ধি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো সে আমাদের ঘরের কাছেই এসে হানা দিয়েছে। আচমকা এই আক্রমণে যখন সবাই সন্ত্রস্ত তখন কেউ কেউ এর প্রতিকারে হাস্যকর সমাধানও দিয়ে যাচ্ছিলেন। এরা মানুষ নিয়ে কারবার করেন। তাই করোনা পরবর্তী অবশিষ্ট পৃথিবী যদি হাতছাড়া হয়ে যায় এই ভয় মৃত্যুভয় থেকেও তাদের বেশি তাড়িত করে। আবার অনেকেই ভেবেছিলেন সব পীঠস্থান বন্ধ হয়ে গেছে, এবার বিজ্ঞানের জয় সুচিত হবে আর অন্ধকার দূর হবে। কিন্তু কই? করোনা মানুষকে চিনতেই পারলনা, মানুষ তার দুর্বলতা বুঝে নিল – এই ভেবে অবসর বিনোদনের ফাঁকে কারবার গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো একদল মানুষ। বিদ্বেষ ছড়ানো, মিথ্যা প্রচার, রাজনৈতিক প্রোপাগেণ্ডা ইত্যাদি শুরু হয়ে গেলো জোরকদমে। এদিকে মৃত্যুর সঙ্গে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লড়ে যাচ্ছে কেউ, কেউ হেরে যাচ্ছে, কেউ জয়ী হয়ে ফিরছে ম্লানমুখে। আরেকটি দল মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে এক পরিচিত শত্রুর বিরুদ্ধে। সেই শত্রু হল ক্ষুধা। কিন্তু ক্ষুধায় যে মানুষ মরে এই সত্য এদের অনেকেই কোনোদিন কল্পনাও করেনি। সেই কল্পনার অতীত বাস্তব সামনে এসে দাঁড়ালো ভীষণ মূর্তি নিয়ে। অনেকের অনেক স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল – বিয়ে করবে, ছেলেমেয়ে মানুষ করবে, বার্ধক্য কাটবে নিশ্চিন্তে অথবা নিজের সঙ্গে আর দশটা পরিবার চলবে। সব কর্পুরের মত ধীরে ধীরে চোখের সামনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

দাস পদবির এক পরিবার আমাদের গ্রামে ভাড়া থাকে। বাড়ি অনেক দূর। স্বামী-স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে চার জনের পরিবার। কর্তা মিষ্টি দোকানের কর্মচারি। কোনোদিন কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। লকডাউন ঘোষিত হলো, বাড়ি ফেরা হলো না। এখন কী অবস্থা সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের গ্রাম একধরণের স্যাটেলাইট ভিলেজ। বেশির ভাগ লোক খেত খামার ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। এই প্রজন্ম আর এসবে নেই। কেউ চাকরি করে, কারো পাইকারি ব্যবসা আছে। তারপর কেউ দালালি করে পেট চালায়, কেউ চা-পান বিক্রেতা, সব্জি বিক্রেতা, দোকানি, বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর রয়েছেন দিনমজুর, চাষি, মৎস্যজীবী ইত্যাদি। গরিব পরিবারের ছেলেরা দেশে বিদেশে কষ্টার্জিত পয়সা দিয়ে বাড়ির চেহারা পাল্টাচ্ছে। হঠাৎ সব কিছু বিচ্ছিরি রকমের এলোমেলো হয়ে গেলো।

ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে দুটি অন্নের যোগান দিতে মানুষ নামছে। হয়তো এদের অনেকেই জানে না নিজেদের ভবিষ্যত। মুদি দোকান আর ওষুধের দোকান সামগ্রী আনতে পারছে না, কারণ শহরের পাইকারি দোকানে কর্মচারি নেই। কেউ জীবাণুর ভয়ে তো কেউ মানুষ নামক জীবের ভয়ে পথ মাড়াচ্ছে না। তাই অত্যাবশ্যক সামগ্রী গ্রামে পৌঁছাতে পারছে না। বাজার নেই, তাই শাক-সব্জি নেই। সরকারি ব্যবস্থা নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে বরাবরের মতো, অর্ধেক পৃথিবীর মালিক হওয়ার নেশায় যারা বুঁদ তাদের কাছে কী আশা করা যায়।

প্রত্যন্ত গ্রামগুলো অনেকটা অতীতে ফিরে গেছে। ভাঁড়ার ঘর ক্রমশ খালি হচ্ছে। যারা মাঠ ছেড়ে পথে নেমেছিল তারা আবার মাঠেই নামছে। বাকিটা অনেকটা আমাদের গ্রামের মতই। বাজার নেই, শ্রমিক নেই, তাই খরার মাঠে শুকিয়ে যাচ্ছে অনেকের ফসল । আর চাবাগান, সে কোনদিন ভালো ছিল ! অনাহার অর্ধাহার সেখানের নৈমিত্তিক ব্যাপার। তার সঙ্গে যোগ হল ঘরে বসে হাহাকার।

আরেকটা দিক মানসিক পরিবর্তন। দিনরাত হাত পা পরিষ্কার রাখতে গিয়ে, মানুষের স্পর্শ থেকে সরে থাকতে থাকতে শুচিবাই, সন্দেহ সহ নানা ধরণের বাতিক ব্যাপক রূপ নিতে পারে। অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, বিচ্ছিন্নতা, উদ্বেগ প্রতি মুহুর্তে মানুষকে আঘাত করছে। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মানসিক যন্ত্রণা আরও ব্যাপক। হাইপোকন্ড্রিয়াক, অসিডি, সিডি, এফএনডি ইত্যাদি সমস্যা থাকা মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, আর সামান্য মানসিক দুর্বলতা থাকা মানুষের নতুন উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এইসব মানসিক সমস্যাকে আমাদের শিক্ষিত সমাজও পাগলামি ভাবে। আর এর সুযোগ নিয়ে মুল্লা-তান্ত্রিক-বুজরুকি দলের বাড়াবাড়ি চুড়ান্ত রূপ নিতে পারে।

WhatsApp Image 2020-04-18 at 10.10.34 PM

ত্রাণ সংগ্রহ করতে ভিড় জমিয়েছেন লোক। একমাস আগেও এদের অনেকেই সচ্ছ্বল ছিল। ছবি: সাদিক মোহাম্মদ লস্কর

আমি ২০০০ সালে বলেছিলাম, নতুন সহস্রাব্দ শুধু ক্যালেন্ডার বদল নয়, বিশ্বজুড়ে এক আমূল পরিবর্তন হবে, যা আমাদের প্রত্যন্ত বরাক উপত্যকায়ও আছড়ে পড়বে, এই পরিবর্তন সম্পন্ন হবে ২০২০ সালে। সম্ভবত ২০০২ সালে লক্ষ্মীপুরে এক সরকারি সভায় এই কথা বলেছিলাম গুণীজনদের সামনে বিশদ ভাবে। বয়স কম ছিল, তাই বলতে পারতাম। ২০১৭ সালে ফেসবুকে একথা আবার বলেছিলাম, কেন যেন মনে হয় এই কথা কৈশোরে দেখা আকাশ কুসুম নয়। ২০১৯ সালে আবার এই কথা বলতে চাইছিলাম, লোকে হাসবে ভেবে আর লিখিনি । এই অনুমান করতে কোনও বিশেষ শক্তির দরকার নেই। মানুষের সামুহিক গতিবিধি লক্ষ করে সহজেই এই কথাটা অনুমান করে বলা যায়। আরও একটা ব্যাপার আমি প্রায়ই আমার ঘনিষ্টমহলে বলতাম – এমন এক দিন আসবে যখন রাস্তায় শুধু ডেলিভারি ভ্যান, আম্বুলেন্স, পুলিশ ইত্যাদি চলবে। এই কথা বলেছিলাম বিজ্ঞানের অগ্রগতি লক্ষ করে। কিন্তু এভাবে জোর করে এই পরিস্থিতি এত তাড়াতাড়ি নিজের জায়গা করে নেবে তা ভাবতেও পারিনি।

করোনা বড় বেদনাদায়ক। কতটুক তা একজন আক্রান্ত ব্যক্তিও ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় আঘাত তখনই লাগবে যখন আক্রান্ত ব্যক্তি একলা বসে কিছু স্মৃতি রোমন্থন করবেন, ‘কোথায় গিয়ে এই রোগটা নিজের শরীরে বয়ে আনলাম, তারপর কার কার শরীরের সংস্পর্শে এলাম।’ এই চিন্তাটাই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে, ‘আমার জন্য আর কে কে এই ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার হল !’ তাই সব গোড়ামি ছেড়ে ঘরে থাকাটাই শ্রেয়। নিজের জন্য না হলেও আপনজনের কথা ভেবেই ঘরে থাকতে হবে। এই দুঃসময়ে মানুষের ঘরে থাকা নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মানুষ এসবে অভ্যস্ত নয়। ঘরের বাইরে যা যা নিয়ম মেনে চলা বা ঘরে ফিরে নিজের পরিবারকে বাঁচাতে যা যা করণীয়, কেউ তা করবে না। কারণ বেশির ভাগ মানুষ এসবকে হাস্যকর ভাবে।

আমদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিরাও এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত নয়। এখন প্রয়োজন সব বিলাসিতা ত্যাগ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে খরচ করা। ক্ষুধার্তদের মুখে অন্নের যোগান দেওয়া জরুরি। ঘরে বসেই যেন রোজগার করা যায়, অর্থব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই পরিকাঠামো তৈরিতে জোর দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা যেন মানসিকভাবে সুস্থ থাকে আর তাদের শিক্ষা যেন ব্যাহত না হয় সে ব্যবস্থা করতে যা খরচ হয়, করতে হবে। এই সময় আণবিক বোমা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে তাও করতে হবে। সামরিক শক্তিকে অন্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। যুদ্ধবিমান দিয়ে জীবাণু মারা যায় না, তাই বিজ্ঞানের ব্যবহার অন্যত্র করতে হবে। পুরো বিশ্বের মানুষকে অহিংস নীতি পালন আর সহজ জীবন যাপনের অভ্যাস করতে হবে। কারণ কথায় আছে, এক মাঘে শীত যায় না।


সাদিক মোহাম্মদ লস্কর বরাক হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন কমিটির কার্যকরী সদস্য।

কোভিড-১৯: আমাদের কী করণীয়?

April 17, 2020
FEATURE-IMAGE-PS-What-we-should-do-about-COVI.width-1400

PHOTO • LABANI JANGI
প্রবন্ধে ব্যবহৃত দুটি ছবিতেই দিল্লি ও নয়ডা থেকে পায়ে হেঁটে উত্তরপ্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্যের গ্রামে প্রত্যাবর্তনরত পরিযায়ী শ্রমিকদের যাত্রাকে রূপ দেওয়ার প্রয়াস করেছেন শিল্পী। লাবনী জঙ্গি, একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী যিনি শ্রমিক পরিযান বিষয়ে কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশাল সাইন্সেস থেকে পিএইচডি করছেন।

কোভিড ১৯ -এর সংকট সামলাতে সরকার যে ‘প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছে তা আদতে মূঢ়তা ও নির্বুদ্ধিতার একটি খিচুড়ি বিশেষ। লিখেছেন  পি সাইনাথ

করোনা মহামারি বিষয়ে প্রথম বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে থালা বাসন পিটিয়ে অশুভ আত্মাকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর নিদান দিয়েছিলেন।

পরের বক্তৃতা শুনে ভয়ে আমাদেরই থরহরিকম্প অবস্থা!

সাধারণ মানুষ, বিশেষত দরিদ্র মানুষ কীভাবে খাবার ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাবে সে বিষয়ে একটি কথাও না বলে সামনে কি ভয়ানক বিপদ অপেক্ষা করছে তাই বলে আমাদের আতঙ্কিত করলেন। মধ্যবিত্ত দোকান-বাজারে ভিড় জমালো যা দেশের হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে করা সহজ নয়। সহজ নয় সেইসব পরিয়ায়ী শ্রমিকদের পক্ষে যাঁরা শহর ছেড়ে নিজেদের গ্রামের পথে পাড়ি দিয়েছেন; সহজ নয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিকদের পক্ষে। যেসব কৃষক রবিশস্য খেত থেকে তোলার ব্যবস্থা করতে পারেননি বা পারলেও বিক্রি করতে পারেননি, তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। শত সহস্র প্রান্তিক মানুষের পক্ষে সহজ নয়-ই।

গতকাল — ২৬শে মার্চ অর্থমন্ত্রী প্যাকেজ ঘোষণা করে মুখ রক্ষা করেছেন — গণবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেয় ৫ কিলোর উপরে আরও ৫ কিলো গম অথবা চাল দেওয়া হবে আগামী তিন মাস। এখানেও পরিষ্কার নয় যে এই অতিরিক্ত ৫ কিলো বিনামূল্যে দেওয়া হবে কি না। যদি বিনামূল্যে না হয় তাহলে লাভ নেই। বিভিন্ন চালু প্রকল্পে যে অর্থ বরাদ্দ করা আছে তা-ই এই প্যাকেজের উপাদান। এমজিএনরেগা প্রকল্পে ২০ টাকা মজুরি বৃদ্ধি ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়েছিল — কাজের দিন বাড়াবার কথা কোথায় বলা হল? আর তা যদি তাঁরা এখনই করতে শুরু করেন তাহলে সামাজিক দূরত্বের নিয়ম কেমনভাবে পালন করবেন? কাজ আবার শুরু হতে যে বিস্তর সময় লাগবে সেইসময়ে মানুষ কী করবে? তাঁদের স্বাস্থ্য তখনও কাজ করার মতো অবস্থায় থাকবে তো? এমজিএনরেগা কর্মীদের প্রাপ্য মজুরি কাজ থাক না থাক প্রতিদিন সব মজুর ও কৃষককে আমাদের দিতেই হবে।

পি এম-কিষান যোজনা মোতাবেক ২,০০০ টাকা সুবিধা আগেই ঘোষিত হয়েছিল, যা এখনও দেয় – তাহলে নতুন কী পাওয়া গেল? তিন মাসের শেষে না দিয়ে এই অর্থ দেওয়া হবে শুরুতেই। এই মহামারি এবং লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিতে যে ১.৭ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হল তার হিসাব অর্থমন্ত্রী ভেঙে বলেননি – এর নতুন উপাদানগুলি কী? এর কোন কোন অংশ পুরোনো অথবা চালু প্রকল্পের বরাদ্দ জোড়াতালি দিয়ে এই অর্থের পরিমাণটি সাজিয়ে তোলা হয়েছে? একে মোটেই জরুরি অবস্থা সামাল দেওয়ার উপায় হিসাবে ধরা যায় না। তার উপর আবার, ভাতাভোগী, বিধবা ও প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের, আগামী তিনমাসের জন্য মোট ১,০০০ টাকা দুই দফায় দেওয়া হবে! আর জন-ধন যোজনার অধীনে ২০ কোটি মহিলা প্রত্যেকে ৫০০ টাকা করে পাবেন আগামী তিনি মাসের জন্য! এ তো নামমাত্রও নয় – চূড়ান্ত অশ্লীল।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ঋণের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ালে কী লাভ হবে যখন চালু ঋণের অর্থ পেতেই কালঘাম ছুটে যায়? আর এই ব্যবস্থা ঠিক কেমনভাবে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের গ্রামে ফিরতে সাহায্য করবে? পরিযায়ীরা এর দ্বারা উপকৃত হবেন বলে যে দাবী করা হচ্ছে তা তো প্রমাণ হচ্ছে না। আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার, তার উপর প্যাকেজ ঘোষণাকারীদের হাবভাবও কম ভয়াবহ নয়। তৃণমূল স্তরের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে এদের কোনও ধারণাই নেই।

002-IMG_20200326_154532-PS-What_we_should_do_.width-1440

PHOTO • LABANI JANGI
প্রবন্ধে ব্যবহৃত দুটি ছবিতেই দিল্লি ও নয়ডা থেকে পায়ে হেঁটে উত্তরপ্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্যের গ্রামে প্রত্যাবর্তনরত পরিযায়ী শ্রমিকদের যাত্রাকে রূপ দেওয়ার প্রয়াস করেছেন শিল্পী। লাবনী জঙ্গি, একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী যিনি শ্রমিক পরিযান বিষয়ে কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশাল সাইন্সেস থেকে পিএইচডি করছেন।

কোনওরকম সামাজিক সুরক্ষা বা সামাজিকভাবে দুর্বলদের জন্য কোনও পরিকল্পনা ছাড়া আমরা এই যে ধরনের লকডাউন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি তাতে উল্টো-পরিযান শুরু হয়ে যেতে পারে এবং তা শুরু হয়েও গেছে। এর গভীরতা ও ব্যাপ্তি সঠিকভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব। কিন্তু বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা খবর থেকে বোঝা যাচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ যে নগর ও শহরগুলিতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন সেগুলিতে লকডাউন ঘোষিত হওয়ায় নিজেদের গ্রামের পথে পাড়ি দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে সবেধন নীলমণি পরিবহনটিই এই ঘরমুখো মানুষদের একমাত্র সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে – নিজেদের দুটি পা। কেউ কেউ সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের বাড়ি। ট্রেন বাস ভ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে মাঝ রাস্তায় আটকে পড়েছেন। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হবে।

ভাবুন দেখি, একদল মানুষ গুজরাটের শহর থেকে হেঁটে চলেছেন রাজস্থানের গ্রামের দিকে; হায়দ্রাবাদ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার দূর দূরান্তের গ্রামের পথে; দিল্লি থেকে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের গ্রামের দিকে; মুম্বই থেকে না জানি কত দিকে। এঁরা যদি কোনও ত্রাণ না পান তাহলে খাবার আর জলের অভাবেই একটা সর্বনাশ ঘটে যাবে। এঁরা কলেরা ও উদরাময় ইত্যাদির মতো পরিচিত ব্যাধির কবলে পড়বেন।

তাছাড়া এই পরিস্থিতিতে যে ধরনের অর্থনৈতিক দুর্দশা তৈরি হতে পারে তাতে মৃত্যু হবে মূলত শ্রমিক ও কমবয়সীদের। জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী, টি সুন্দরারামন পারি-কে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক দুর্দশা ছাড়াও দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা শেষমেশ করোনা-ঘটিত মৃত্যু ছাড়িয়ে অন্যান্য অসুখে মৃত্যু নিয়ে জেরবার হবে।

“৬০-এর কোঠায় এবং তার উপরে থাকা ৮ শতাংশ নাগরিকের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবায় অব্যবস্থা দেখা দিলে কর্মক্ষম ও কমবয়সীদের উপরেও বড়ো আঘাত নেমে আসতে পারে।”

ন্যাশানাল হেল্‌থ সিস্টেমস রিসোর্সেস সেন্টারের প্রাক্তন আধিকারিক ডঃ সুন্দরারামন জোরের সঙ্গে যে কথাটি বলছেন তা হল এইসময়ে আশু প্রয়োজন হল, “ঘরফেরতা মানুষের উলট-পরিযান এবং কর্মহীনতার দিকে নজর দিয়ে তার সমাধানের বন্দোবস্ত করা। তা না করতে পারলে এ যাবত দরিদ্র মানুষকে জেরবার করে রেখেছে যে সব রোগ তদ্বজনিত মৃত্যু করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।” বিশেষত যে নামমাত্র মজুরিটুকু পান তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনাহারের কবলে পড়ে শহরের কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা যদি গ্রামমুখো পরিযানে বাধ্য হন।

03-After-earning-enough-people-generally-retu.width-1440

PHOTO • RAHUL M.
প্রতি সপ্তাহে অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর এবং কেরালার কোচির মধ্যে অনবরত যাতায়াতে বিধ্বস্ত পরিযায়ী শ্রমিকের দল

পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের কাজের জায়গাতেই থাকেন। সেই জায়গা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদেরও সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে — তাঁরা যাবেন কোথায়? সবাই এই বিশাল দূরত্ব হেঁটে অতিক্রম করতে মোটেই সক্ষম নন। তাঁদের রেশন কার্ডও নেই — এঁদের কাছে খাবার পৌঁছাবেনই বা কেমন করে?

ইতিমধ্যে, অর্থনৈতিক দুর্দশা তুখোড় গতিতে এগোচ্ছে।

এও দেখা যাচ্ছে যে আবাসনগুলির মানুষজনের মাথায় একথা ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে যে এই সব পরিয়ায়ী শ্রমিক, গৃহ সহায়ক, বস্তিবাসী দরিদ্র মানুষরাই সমস্যার কারণ। বাস্তবে, কোভিড-১৯-এর বাহক, যেমনটা হয়েছিল সার্স-এর ক্ষেত্রে, বিমান যাত্রায় অভ্যস্ত উচ্চ শ্রেণির মানুষেরা – অর্থাৎ আমরা। এদিকে নজর না দিয়ে আমরা এই অনভিপ্রেত মানুষদের বিতাড়িত করে শহর পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করছি! ভেবে দেখুন – কোনও সংক্রমিত বিমানযাত্রী যদি এই ফিরতি পরিযায়ী শ্রমিকদের একজনকেও সংক্রমিত করে থাকেন, তাহলে এঁরা যখন নিজ নিজ গ্রামে ফিরবেন, তখন সেখানকার অবস্থা কী দাঁড়াবে?

অবশ্য একই কিংবা কাছাকাছি রাজ্যের কিছু পরিযায়ী শ্রমিক চিরকালই হেঁটে নিজেদের গ্রামে ফেরেন। যাত্রাপথে ধাবা অথবা চায়ের দোকানে কাজ করে খাওয়া জুটিয়ে নেওয়া আর রাতে সেখানেই ঘুমানো — এই ছিল চিরাচরিত পদ্ধতি। এখন এগুলির বেশিরভাগ বন্ধ থাকায় অবস্থা কী দাঁড়াবে?

সম্পন্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মাথায় ঢুকেছে যে তাঁরা বাড়িতে থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্তত তাতে আমরা নিজেরা এই ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাব! আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে এই অর্থনৈতিক দুর্দশা একসময় আমাদের দিকেই ধেয়ে আসবে। অনেকের জন্যই ‘সামাজিক দূরত্ব’-এর দ্যোতনা ভিন্ন। আমরা দুহাজার বছর আগেই বর্ণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম! আমাদের এই লকডাউনের বন্দোবস্তটিও সেই শ্রেণি ও বর্ণভিত্তিক বৈষম্যেই গাঁথা!

দশ লক্ষ মানুষ যে আমাদের দেশে প্রতি বছর যক্ষ্মা রোগে মারা যান তাতে কোথাও কোনও ফারাক পড়ে বলে মনে হয় না। ১০০,০০০ শিশুর যে প্রতি বছর উদরাময় রোগে প্রাণ যায় তা নিয়েও আমাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ‘ওরা’ তো আর আমরা না। সুন্দর মানুষজন যখন দেখে যে কিছু মারণ রোগের থেকে তাদেরও মুক্তি নেই তখনই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেমনটা হয়েছিল সার্স রোগের সময়ে, হয়েছিল ১৯৯৪ সালে সুরাটের প্লেগের সময়ে। দুটিই ছিল মারাত্মক রোগ কিন্তু ভারতবর্ষে যত মানুষের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রকৃতপক্ষে মৃতের হার ছিল তার চেয়ে কম। অবশ্য এগুলি বেশ অনেকটাই মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। আমি তখন সুরাটের বিষয়ে লিখেছিলাম —“প্লেগের জীবানু অতি মারাত্মক কারণ এ শ্রেণি বৈষম্য মানে না… তার চেয়েও খারাপ কথা এই যে এগুলি প্লেনের অভিজাত ক্লাব ক্লাস সিটে চড়ে সোজা নিউ ইয়র্ক পৌঁছে যেতে পারে।”

04-IMG_1636-PS-What_we_should_do_about_COVID.max-700x560

PHOTO • JYOTI SHINOLI
মুম্বইয়ের চেম্বুর এলাকার মহুল গ্রামে কর্মরত সাফাইকর্মীরা বিষাক্ত আবর্জনার মধ্যে কাজ করেন অতি সামান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে 

আমাদের এই মুহূর্তেই কিছু করা দরকার। 
আমরা কেবলমাত্র একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধেই লড়ছি না
 — মহামারি নিজেই একটি ‘প্যাকেজ’। 
এর মধ্যে নিজেদের সৃষ্টি করা বা বাড়িয়ে তোলা
 অর্থনৈতিক দুর্গতি এমন এক উপাদান 
যা আমাদের চরম দুর্দশা থেকে একেবারে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে

আর আমাদের এই ধারণা যে আমরা একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধেই মাত্র লড়ছি — একবার একে নির্মূল করতে পারলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে — এই ভাবনাটিই বিপজ্জনক। অবশ্যই আমাদের কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে — ১৯১৮ সালের সেই মহামারি যাকে ভুল করে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নাম দেওয়া হয়েছিল— বর্তমান সংকট তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে। (ভারতবর্ষে ১৯১৮-২১ সালের মধ্যে ১৬-২১ মিলিয়ন মানুষ মারা যান। বস্তুত ১৯২১ সালের আদমশুমারিতেই একমাত্র গ্রামীণ জনসংখ্যায় ব্যাপক হ্রাস লক্ষ্য করা গিয়েছিল।)

কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র কোভিড-১৯ কে নিয়ে মেতে থাকা মানে সবকটা জলের কল খোলা রেখে মেঝে মুছে শুকনো করার চেষ্টার সামিল! আমাদের দরকার এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অধিকার, ও ন্যায্য পাওনাগুলির দাবিকে জোরদার করে তুলতে সক্ষম হবে।

১৯৭৮ সালে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত কিছু মহতী মানুষ আলমা আটা ঘোষণাপত্র রচনা করেছিলেন — এই কাজটি যখন হয়েছিল তখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) পাশ্চাত্য দেশের সরকারি মদতপুষ্ট বাণিজ্যসংস্থাগুলির লেজুরবৃত্তি শুরু করেনি। এই ঘোষণাপত্রটিই “২০০০ সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য” এই ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। “বিশ্বের সম্পদ সম্পূর্ণ ও যথাযথভাবে ব্যবহার করে…” এই কাজ করা সম্ভব বলে এই ঘোষণাপত্রের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।

৮০-এর দশক থেকে স্বাস্থ্যের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নির্ধারকগুলিকে বোঝার ঝোঁক যেমন বাড়ছিল সেই সময়ে আরও একটি প্রবণতাও বাড়ছিল। বরং আরও দ্রুত গতিতে বাড়ছিল: নয়া উদারনীতিবাদ।

৮০ থেকে ৯০-এর দশকের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান যে আদতে মানবাধিকার, এই ভাবনা সারা বিশ্ব জুড়ে আস্তাকুঁড়ে ঠাঁই পেল।

১৯৯০-এর মাঝামাঝি শুরু হল ছোঁয়াচে রোগের বিশ্বায়ন। কিন্তু এই মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে বহু রাষ্ট্র সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও বেশি করে ব্যক্তিমালিকানাধীন করে তুলল। ভারতবর্ষে চিরকাল ব্যক্তিমালিকানার রমরমা ছিলই। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় ন্যূনতম যেসব দেশে আমাদের দেশ তাদের মধ্যে পড়ে — মোট জাতীয় উৎপাদনের ১.২ শতাংশ মাত্র। যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনিতেই রুগ্ন ছিল ৯০-এর দশক থেকে তাকে আরও দুর্বল করে দেওয়া হল গৃহীত নীতির ভিত্তিতে। দেশের বর্তমান সরকার জেলা স্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থাতেও বেসরকারিকরণকে স্বাগত জানাচ্ছে।

আজকের তারিখে দেশে গ্রামীণ পরিবারের ঋণের দ্রুততম হারে বেড়ে চলা খাতটি হল স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে নেওয়া ঋণ। ২০১৮ সালের জুনে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানান তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, ২০১১-১২ – এই একটি বছরেই ভারতবর্ষের ৫.৫ কোটি মানুষ শুধুমাত্র স্বাস্থ্যখাতের ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে দরিদ্র হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়েছিলেন। তার মধ্যে আবার ৩.৮ কোটি মানুষ শুধুমাত্র ওষুধপত্রের খরচ বইতে গিয়ে দারিদ্রসীমার নিচে চলে গিয়েছিলেন।

ভারতবর্ষে কৃষক আত্মহত্যার কোপে পড়া হাজার হাজার পরিবারে একটি চমকপ্রদ সাধারণ বিষয় লক্ষ্য করা যায়: চিকিৎসার ভয়াবহ খরচ মেটাতে অধিকাংশ সময়েই ঋণ নিতে হয় মহাজনদের কাছ থেকে।

05-_SR07661-PS-What_we_should_do_about_COVID-.width-1440

PHOTO • M. PALANI KUMAR
দেশের অন্যান্য স্থানের মতোই চেন্নাইয়েও চুক্তিভিত্তিক সাফাইকর্মীরা ন্যূনতম সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করেন 

কোভিড-১৯-এর সঙ্গে এঁটে উঠতে প্রস্তুত এমন মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে সবচেয়ে কম। দুঃখের বিষয় এই যে ভবিষ্যতে অন্য নানা নামে আরও কোভিড আসবে। ৯০-এর দশক থেকে আমরা সার্স এবং মার্স (দুটিই করোনাভাইরাস ঘটিত রোগ) দেখেছি; দেখেছি সারা বিশ্বে একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া আরও বিভিন্ন রোগ। ভারতের সুরাটে ১৯৯৪ সালে প্লেগ দেখা দিল। কোন বিশ্ব আমরা গড়ে তুলেছি এবং কোথায় এসে পৌঁছেছি তা এর থেকেই ঠাহর হয়।

বিশ্ব ভিরোম প্রকল্পের অধ্যাপক ডেনিস ক্যারোল সম্প্রতি জানিয়েছেন– “আমরা বাস্তুজগতের এমন গভীরে প্রবেশ করেছি যার দখলদারি আগে কখনও হয়নি…” তেল এবং খনিজ পদার্থ উত্তোলন করতে এমন সব নির্জন স্থানে ঢুকে পড়েছি যেখানে পূর্বে মানুষের খুব সামান্যই বসত ছিল – এখন এর মূল্য তো দিতেই হবে। ভঙ্গুর বাস্তুব্যবস্থায় আমাদের এই বহিরাক্রমণ, কেবল পরিবেশেই বদল আনছে না স্বাস্থ্যহানির সম্ভবনাও তৈরি করছে; যেমন মানুষ আর অপর জীবজন্তুর মধ্যে স্থানিক ব্যবধান কমে যাওয়ার ফলে স্বল্পপরিচিত অথবা একেবারে অপরিচিত সব ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে।

সুতরাং, আগামী দিনে আমরা এমন আরও অনেক কিছু দেখব।

কোভিড-১৯ ভাইরাসের ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনা অপেক্ষা করে আছে।

এক, আমাদের স্বার্থে এই ভাইরাস বিবর্তন ঘটে এক সপ্তাহের মধ্যে নিকেশ হয়ে যেতে পারে।

অথবা নিজের স্বার্থে পরিবর্তিত হয়ে অবস্থা আরও শোচনীয় করে তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে এক নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হবে।

আমরা কী করতে পারি? ভারতবর্ষের গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে থেকে বহু অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা যে সকল মত দিয়েছেন সেগুলি ছাড়া অথবা তার সঙ্গেই আমি এই প্রস্তাবগুলি রাখছি। (কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাকে ঋণ, ব্যক্তিমালিকানার প্রাধান্য ও লগ্নি পুঁজির ব্যর্থতার বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে চাওয়ার প্রবণতাও আছে) কেরল সরকারের ঘোষিত নীতির কয়েকটিকে অনুপ্রেরণা হিসাবে নিয়ে বলা যায়-

Ø প্রথমেই যা করতে হবে: আমাদের ৬ কোটি টনের কাছাকাছি ‘উদ্বৃত্ত’ মজুত খাদ্য জরুরি ভিত্তিতে বন্টন করা। এই খাদ্য সত্বর পৌঁছে দিতে হবে কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিক এবং অর্থনৈতিক সংকটে বিধ্বস্ত দরিদ্র মানুষের কাছে। বর্তমানে বন্ধ থাকা সামাজিক ক্ষেত্রগুলিকে (যেমন স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি হল, ও অন্যান্য ভবনগুলি) আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিক ও গৃহহীনদের আশ্রয় স্থল হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

Ø দ্বিতীয় এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি হল সমস্ত কৃষককে খারিফ মরশুমে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উৎসাহিত করা। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি এক ভয়ঙ্কর জায়গায় পৌঁছাবে। এমতাবস্থায় অর্থকরি ফসল চাষ মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। করোনা ভাইরাসের টিকা/ওষুধ আবিষ্কার হতে এখনো ঢের দেরি। তার মধ্যে সঞ্চিত খাদ্যশস্য তলানিতে ঠেকবে।

Ø সরকারকে কৃষকের ফসল একবারে কিনে নিতে হবে। অনেকে লকডাউনের কারণে রবি ফসল তোলা শেষ করতে পারেননি। যাঁরা পেরেছেন তাঁরাও তা বিক্রির জন্য কোথাও পাঠাতে পারছেন না। খারিফ ফসল চাষের জন্যেও কৃষকের দরকার পড়বে চাষের সামগ্রী, অন্যান্য পরিষেবা ও বিপণন ব্যবস্থায় সহযোগিতা।

Ø ব্যক্তিমালিকানাধীন বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাকে সরকারের অধিগ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। হাসপাতালগুলিকে নিজেদের চৌহদ্দির ভিতরে একটি করে ‘করোনা কেন্দ্র’ স্থাপন করার পরামর্শ দেওয়া আদৌ যথেষ্ট হবে না। গত সপ্তাহে স্পেন সব হাসাপাতাল ও স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার জাতীয়করণ করেছে কারণ তারা বুঝেছে যে লাভের লক্ষ্যে কাজ করা কোনও ব্যবস্থা এই সংকট সামাল দিতে পারবে না।

Ø সাফাই কর্মচারীদের এই মুহূর্তে সরকারি/পৌরসভার নিয়মিত পূর্ণসময়ের কর্মীতে পরিণত করে, তাঁদের বর্তমান বেতনের উপর আরও ৫,০০০ টাকা করে দিতে হবে এবং তাঁদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা দিতে হবে, যা তাঁদের কোনওদিন দেওয়া হয়নি। তাছাড়াও তাঁদের এত দিন যা দেওয়া হয়নি সেই সুরক্ষা সরঞ্জামও দিতে হবে। এমনিতেই সামাজিকভাবে দুর্বল সাফাইকর্মীদের আমরা তিন দশক ধরে আরও ক্ষতি করেছি — সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিয়ে, বেসরকারি সংস্থার হাতে তাঁদের কাজের দায়িত্ব তুলে দিয়ে — যে সংস্থাগুলি এই কর্মীদের বাড়তি কোনও সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে কম মজুরিতে পুনর্নিয়োগ করে।

দেশের গরিব মানুষের জন্য বিনামূল্যে আগামী তিনমাসের রেশন ঘোষণা করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তা বণ্টনের বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করতে হবে।

Ø এই মুহূর্তে আশা, অঙ্গনওয়াড়ি ও মিড-ডে মিল কর্মী — যাঁরা সামনের সারিতে থেকে এই লড়াই করছেন — তাঁদের বিধিবদ্ধ সরকারি কর্মীতে পরিণত করতে হবে। ভারতবর্ষের শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য তাঁদের হাতে রয়েছে। তাঁদেরও পূর্ণ সময়ের কর্মীতে পরিণত করে, সঠিক বেতন ও সুরক্ষা সামগ্রী দিতে হবে।

Ø কৃষক ও দিনমজুরদের এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দৈনিক এমজিএনরেগা নির্ধারিত মজুরি দিতে হবে। শহরের দিনমজুরদের ওই সময়েকালে, মাসে ৬,০০০ টাকা করে দিতে হবে।

এই মুহূর্তেই আমাদের এই বন্দোবস্তগুলি করা শুরু করতে হবে। 
সরকারি ‘প্যাকেজ’ আদতে মূঢ়তা ও নির্বুদ্ধিতার খিচুড়ি বিশেষ।  
আমরা কেবলমাত্র একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছি না 
—মহামারি নিজেই একটি ‘প্যাকেজ’। 
এর মধ্যে নিজেদের সৃষ্টি করা বা বাড়িয়ে 
তোলা অর্থনৈতিক দুর্গতি এমন এক উপাদান 
যা আমাদের চরম দুর্দশা থেকে একেবারে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ভাইরাসের এই গতি যদি আর সপ্তাহ দুয়েক থাকে তাহলে কৃষকদের খারিফ মরশুমের জন্য খাদ্যশস্য চাষ করতে বলাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

একই সঙ্গে আমরা কি যথেষ্ট নিরপেক্ষভাবে পারব কোভিড-১৯ কে একটি লক্ষণীয়, চোখ খুলে দেওয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে দেখতে? এ এমন এক মোড় যেখান থেকে আমাদের পথদিশা ঠিক করে নিতে হবে। অসম ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার ন্যায্য অধিকার নিয়ে বিতর্ক নতুন করে শুরু তথা নিশ্চিত করার মুহূর্ত এটি।


এই লেখাটির অন্য একটি সংস্করণ প্রথমবার ২৬শে মার্চ, ২০২০ তারিখের দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

বাংলা অনুবাদ: চিলকা

চিলকা কলকাতার বাসন্তী দেবী কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার বিশেষ ক্ষেত্রটি হল গণমাধ্যম ও সামাজিক লিঙ্গ।


 অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও তাঁর হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

July 26, 2018

ড০ তপোধীর ভট্টাচার্যের নিবন্ধ “অসমে বাঙালির শরশয্যা” নিয়ে উদ্ভব হওয়া অগণতান্ত্রিক বিতর্কের অবসান হোক (গণতন্ত্রপ্রিয় সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের যৌথ বিবৃতি)

বরাক উপত্যকার স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিন্তাবিদ তপোধীর ভট্টাচার্যের লেখা  “অসমে বাঙালির শরশয্যা” শীর্ষক একটি নিবন্ধ গত ৩/০৭/২০১৮ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক পত্রিকা “আজকাল” এ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে তাঁকে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে   বিদ্বেষমূলক প্রচার চালানো হয়েছে। এবং বিগত ৮/৭/২০১৮ তারিখে দিসপুর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও রুজু করা হয়েছে। আমরা মনে   করি, ভারতীয় সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে মর্যাদা দিয়ে এই অধিকারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। এবং সেখানে যে সব সীমাবদ্ধতার উল্লেখ আছে, তপোধীরবাবুর লেখাটি   সেগুলির মধ্যেও পড়ে না। তাছাড়া ড০ ভট্টাচার্য একজন অত্যন্ত নিরপেক্ষ এবং সংবেদনশীল ব্যাক্তি। তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন সময় অনেকের  রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ২০১০ সালে ডিফু  ক্যাম্পাসে  “অসমিয়া বিভাগ” চালু করেন। তার দুটি বই “রঙ ও রেখার বিপ্লবে পাবলো পিকাসো” এবং “আসামের রূপকথা”  অসমিয়া ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। এরকম অবস্থায় তাঁকে আসামের  বিরুদ্ধে “ষড়যন্ত্রকারী” হিসেবে  চিহ্নিতকরণ মোটেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছেনা।

fd

  তাছাড়া আসামের বর্তমান পরিস্থিতে এধরনের পদক্ষেপ উসকানি দেওয়ার কাজ করতে পারে। পূর্বেও আসামে ৭০ এবং ৮০র  দশকে বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রককারী,  বদন, ইত্যাদি নানা নামের তকমা জুড়ে দিয়ে বহুলোককে গুমখুন, মবলিঞ্চিং ও হত্যা করা হয়েছে। শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক চিন্তাবিদ হিরেণ গোঁহাইকেও ৮০’র দশকে অনুরূপ পরিস্থিতিরর সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। সুতরাং এরূপ দায়িত্বজ্ঞানহীন অপপ্রচার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রুজু করা মামলা সমগ্র আসামকে এক জাতিগত সহিংস পরিস্থিতিরদিকে ঠেলে দিতে পারে। তাছাড়া গত ২১ জুন ২০১৮ তারিখে রাষ্ট্রসংঘের  জাতিগত হিংসার বিরুদ্ধে নিযুক্ত স্পেশাল রেপোর্টিওর(Special Rapporteur)  এবং এর সাথে জড়িত  আরোও কয়েককটি বিষয়ের স্পেশাল রেপোর্টিওররা আসামে এইরকম একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে উদ্বেগ ব্যাক্ত করেছেন এবং এসমন্ধে ভারত সরকারের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন। অধ্যাপক ভট্টাচার্যের নিবন্ধটিতে রাষ্ট্রসংঘের এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া কিছু প্রকৃত উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে। তাই নিবন্ধটি মোটেই ভিত্তিহীন নয় এবং কোনোধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারেনা।

 সুতরাং আমরা নিম্নসাক্ষরকারীরা মনে করি, ড০ ভট্টাচার্যের নিবন্ধটি সংবিধান স্বীকৃত বাকস্বাধীনতার বৈধ প্রয়োগ।তাসত্ত্বেও মামলা দায়ের করে আইনের অপপ্রোয়গের মাধ্যমে এই সর্বজনশ্রদ্বেয় ব্যাক্তিত্বকে হেনস্থা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। অতএব আসাম সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, ড০ ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলাটি  অবিলম্বে তুলে নেওয়া হোক।

  স্বাক্ষরকারীঃ

১।  বরাক হিউমন রাইটস প্রোটেকশন কমিটি, শিলচর এর পক্ষে তানিয়া সুলতানা লস্কর।

২। নাগরিকত্ব সমন্বয় কমিটির পক্ষে- কিশোর কুমার ভট্টাচার্য।

৩। ফোরাম ফর সিভিল রাইটস এর পক্ষে শিশির দে।

৪। কোরাস, শিলচর এর পক্ষে বিশ্বজিত দাস।

৫। পিপলস সায়েন্স সোসাইটি, এর পক্ষে কৃশাণু ভট্টাচার্য।

৬। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের পক্ষে সঞ্জিব দেব লস্কর।

৭। মাইনোরিটিজ ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশন নগাঁও এর পক্ষে আসাদুল হক চৌধুরী।

৮। নারী মুক্তি সংস্থা এর পক্ষে সিগ্ধা নাথ।

৯। আসাম নাগরিক মঞ্চ এর পক্ষে বিজয় চক্রবর্তী।

১০। গণসুর এর পক্ষে সুব্রত রায়।

১১। মুক্তমন, শিলচর এর পক্ষে দেবরাজ দাশগুপ্ত।

১২। বৈচিত্র লিটিল ম্যাগাজিন এর পক্ষে আনওয়ারুল হক বড়ভূইয়া।

নাগরিকদের মধ্যে যারা সাইন করেছেন।

  ১। কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, বিধায়ক, নর্থ-করিমগঞ্জ, আসাম। ২। সৌমিত্র দস্তিদার, তথ্যচিত্র নির্মাতা,  পশ্চিমবঙ্গ।  ৩। প্রতিভা সরকার, গল্পকার, সমাজকর্মী, পশ্চিমভঙ্গ। ৪। প্রসেনজিত বিশ্বাস, দর্শন বিভাগ, নেহু, শিলং। ৫। সুকল্পা ভট্টাচার্য, ইংরাজি বিভাগ, নেহু, শিলং। ৬। ড০ সুরঞ্জনা চৌধুরী, ইংরাজি বিভাগ, নেহু, শিলং।  ৭। ড০ পল্লবী চৌধুরী, বিজ্ঞানি, ইন্সটিটিউট অফ সিস্মোলজিকেল রিসার্চ,গান্ধীনগর। ৮। ময়ূরী পুরকায়স্থ, টেক ইন্ডিয়া, পুনে। ৯। সম্রাট সেনগুপ্ত, ইংরাজি বিভাগ, সম্মিলনী। ১০। ডঃ অমিয় দে, রেড লাবান কলেজ, শিলং। ১১। ড০ নবনিতা সেনগুপ্ত, ইঙ্গরাজি বিভাগ, সরশুনা কলেজ, কলকাতা।   ১২। গৌরব সেন, মানবাধিকার কর্মী, কলকাতা। ১৩। দেবস্মিতা কর, ইঙ্গরাজি বিভাগ, বাগবাজার মহিলা কলেজ, কলকাতা।  ১৪। শ্রেয়ণ রায়, সম্পাদক, নিবির। ১৫। অরুণ বিশ্বাস, পরিবেশবিদ। ১৬। ভাস্কর গুপ্ত, অবসরপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন, ১৭। কল্যাণ রুদ্র, চেয়ারম্যান, পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশ প্রদূষ্পণ নিয়ন্ত্রক বিভাগ।  ৮। রুপশ্রী কাহালি, শিল্পী। ১৯।  সৌভিক কর্মকার, রিসার্চ ফিলো, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।  ২০। রম্যানি চক্রবর্তী, রিসার্চ ফিলো, আইআইটি, গৌহাটি।২১।  নিলাঞ্জনা সিনহা, টিইটো, মুম্বাই। ২২। অশোকেন্দু সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ। ২৩। দেবদাস বেনার্জী, সমাজকর্মী। ২৪। উজ্বল ভৌমিক, পান্ডু, গৌহাটি। ২৫। রামজ্যোতি ভট্টাচার্য, রিবই, শিলং। ২৬। ডি পি ভট্টাচার্য, সাংবাদিক, গুজরাট। ২৭। অপূর্ব মুক্তকামী, সমাজকর্মী, পশ্চিমবঙ্গ।২৮। সুরজিত রে, নতুন দিল্লী। ২৯। দিপংকর বসু। ৩০। সুপ্রীয় পাল, শিলং।      ৩১। চন্দ্রোদয় দে, ৩২। তমোজিত সাহা, কবি-প্রাবন্ধিক, শিলচর। ৩৩। জয়শ্রী ভূশন, সমাজকর্মী,  শিলচর।  ৩৪। জয়নাল আবেদিন লস্কর, দারুস সালাম মাজমাউল বাহরাইন, শিলডুবি।   ৩৫। অশোকতরু চক্রবর্তী,  রিসার্চ স্কলার,  আই আই টি, খড়গপুর।৩ ৬। মানস দাস, সমাজকর্মী, শিলচর।   ৩৭। সুশান্ত কর, অধ্যাপক,  তিনসুকিয়া কলেজ, তিনসুকিয়া।   ৩৮। চক্রপাণি দেব বর্মণ, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।        ৩৯। সাবানা মজুমদার, গৃহকর্ত্রী,  শিলচর।  ৪০। পার্থ রঞ্জন চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি কাছাড জেলা কংগ্রেস কমিটি প্রচার বিভাগ।  ৪১। কমল চক্রবর্তী,  সমাজকর্মী,  শিলচর। ৪২। ড০ শম্পা মণ্ডল,  লেকচারার,  সম্মিলনী কলেজ, কলকাতা।   ৪৩। আদিমা মজুমদার, গল্পকার,  শিলচর। ৪৪। ত্বাহা আমিন মজুমদার, হাইলাকান্দী, আসাম। ৪৫। দেবকান্ত দাস, করিমগঞ্জ, আসাম।  ৪৬। দেবরাজ দাসগুপ্ত, শিলচর।  ৪৭। শাখাওয়াত মজুমদার, ক্লাব মুক্তসেনা, শিলচর। ৪৮। সঞ্জীব লস্কর, সোনাই,  আসাম। ৪৯। অরিন্দম চক্রবর্তী, শিল্পী   শিলচর। ৫০। আহমদ হোসাইন লস্কর, ছাত্র, হাইলাকান্দি আসাম।  ৫১। আনছারুল্লাহ তালুকদার, ছাত্র, শিলচর। ৫২। আয়শা মল্লীক, ছাত্রী, কলকাতা। ৫৩। শামীম আরা বড়ভূইয়া, শিক্ষিকা,  উধারবন্ধ, আসাম।  ৫৪। ড০ চার্বাক, অধ্যাপক, আসাম ইউনিভার্সিটি।  ৫৫। আলমআরা বড়ভূইয়া লিনা, বদরপুর, করিমগঞ্জ।  ৫৬। ওয়াহিদুজ্জামান মজুমদার, ছাত্র,হাইলাকান্দি, আসাম।  ৫৭। অধিরত দে, শ্রীরামপুর, পশ্চিমবঙ্গ।  ৫৯। জমিল আহিমেদ লস্কর, শিলচর। ৬০। সোণর আলি, রাতাবাড়ী, করিমগঞ্জ। ৬১। প্রিয়াঙ্কা রায়, শিল্পী, উধারবন্ধ, আসাম।৬২। হিল্লোল ভট্টাচার্য,  সমাজকর্মী, শিলচর।৬৩। প্রদীপ নাথ, শিলচর।  ৬৪। সারওয়ার জাহান লস্কর, ছাত্র, আসাম ইউনিভার্সিটি।৬৫। অলিউল্লাহ লস্কর, আইনজীবী, গৌহাটি হাইকোর্ট।  ৬৬। দেবাশিস চক্রবর্তী,অধ্যাপক, কাছাড় কলেজ, শিলচর।৬৭। পারভেজ খসরু লস্কর, লালা, হাইলাকান্দী।৬৮।সাবর্ণী পুরকায়স্থ,  করিমগঞ্জ, আসাম।৬৯। সুজিত দে, এরালিগুল, করিমগঞ্জ।৭০। এ এম শরীফ উদ্দিন লস্কর, গুমড়া, কাছাড়,৭১।ফারুক আহমেদ লস্কর, বাশকান্দী, শিলচর। ৭২। পিযূস কান্তি দাস, সেভ, শিলচর।৭৩। মকব্বীর আলী লস্কর, বাঁশকান্দী, শিলচর।৭৪। আনিন্দীতা কর, ছাত্রী, শিলচর।৭৫।হিয়া দাস,নাট্যশিল্পী,  শিলচর। ৭৬। শ্বাসত্ব পুরকায়স্থ, করিমগঞ্জ। ৭৭। সৌমদীপ রয় চৌধুরী, শিলং। ৭৮। সঞ্জিব দাস, শিলচর।  ৭৯। অরিত্র বাবাই ধর, শিলচর।৮০। জয় রয়, উধারবন্ধ। ৮১। প্রীয়াংকা মৌলি গুহ, আলিপুর দুয়ার। ৮২। নাসমিন চৌধুরী, সোনাই, অসম। ৮৩। ফয়েজ আহমেদ , হাইলাকান্দি। ৮৪। পিয়া দাস, শিলচর। ৮৫। মাশুক আহমেদ মজুমদার, বড়খোলা। ৮৬। আনন্দ রয়, শিলচর।  ৮৭। সামসুল হক বড়ভূইয়া, হাইলাকান্দি।        ৮৮। যুথিকা দাস, কবি, শিলচর।  ৮৯। গোপাল চৌধুরী, কবি।৯০। জাহানারা মজুমদার, কবি, শিলচর।      ৯১। শহিদুল হক, সমাজকর্মী, করিমগঞ্জ।  ৯২। সুবীর ভট্টাচার্য, সাঙ্গস্কৃতিক কর্মী, শিলচর। ৯৩। বিজিত কুমার সিনহা, শিলচর। ৯৪। আব্দুল হালিম লস্কর, উধারবন্ধ।৯৫।  সাদীক মোহাম্মদ লস্কর, বাঁশকান্দী।  ৯৬। মিঠু বিশ্বাস, রিসার্চ ফিলো, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়।  ৯৭। জগদীশ চৌধুরী, এন এস এভিনিউ, শিলচর।   ৯৮। মস্তাক লস্কর, লালা, হাইলাকান্দি। ৯৯। বিজয় কুমার ভট্টাচার্য, কবি-সাংবাদিক। ১০০। টিংকু খান্না, কলকাতা।

 

নাগরিকত্ব বিলে বিএইচআরপিসি সংবিধান ও মানবাধিকার সম্মত সংশোধনী চায়

May 10, 2018

গত ৯ মে ২০১৮ তারিখে বরাক হিউমেন রাইটস প্রটোকশন কমিটি  কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সফররত জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে নাগরিকত্ব বিল নিয়ে স্মারকপত্র প্রদান করে। বিএইচআরপিসি মনে করে যে পার্শ্ববর্তী দেশের নির্যাতিত মানুষদের নাগরিকত্ব প্রদান করার সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত মহান এবং মানবিক  কাজ। কিন্তু সেইসঙ্গে বিএইচআরপিসি এটাও মনে করে যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধেয়ক এর বর্তমান খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের নিরিখে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আইন পরিণত হলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। সুতরাংবিএইচআরপিসিএই বিলে নিম্নলিখিত সংশোধনি আনার পরামর্শ দেয়ঃ

১। এই বিলের ২নং ধারায় আনা সংশোধনীমতে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান এই তিনটি দেশ থেকে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান এই ছয়টি ধর্মের কোন লোক যদি আইনি কাগজপত্র ছাড়াও ভারতে আসেন তবে তাদেরকে বেআইনি অণুপ্রবেশকারি হিসাবে গণ্য করা হবেনা। বিএইচআরপিসির মতে এই ধারা ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি করে সংবিধানের ১৪নং ধারার উলঙ্ঘন করে।

 অতএব ২ ধারার ১ নং উপধারায় একটি সংশোধনি আনতে হবে যে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ এবং মায়ান্মারের যেসব লোক সাম্প্রদায়িক হিংসা বা সেক্টেরিয়ান ভায়োলেন্স (Sectarian Violence)  এর শিকার হয়ে ভারতে এসেছেন তাদেরকে বেআইনি অণুপ্রবেশকারি হিসেবে গণ্য করা হবেনা।

২। ভারতীয় উচ্চতম ন্যায়ালয়ের  লালবাবু হোসেন এবং অন্যান্য বনাম নির্বাচনী নিবন্ধক এই মামলার প্রদত্ত রায়মতে  ধারা ৬(ক) এর ৭ক উপধারায় একটি নতুন বিধান জুড়ে দিতে হবে যে ভোটার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদেরকে  ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ধরা হবে।

৩। এরকমই তৃতীয় তালিকার ৩ দফায় একটি বিধান জুড়ে দিতে হবে যে ভারতীয় নাগরিকত্ব দাবীর পূর্বশর্ত হিসেবে প্রার্থীকে ১১বছরের জায়গায় ৬ মাসের জন্য ভারতে থাকতে হবে কিংবা ভারতে সরকারি চাকুরী করতে হবে।

 এছাড়াও বিএইচআরপিসি মনে করে যে সাম্প্রদায়িক হিংসার শিকার হওয়া লোকদের পূর্ণ সুরক্ষার জন্য ভারত সরকারের অতিশিঘ্র রাষ্ট্রসংঘের ১৯৬১ সালে গৃহিত রাষ্ট্রহীনতা হ্রাস করা সমন্ধীয় চুক্তিপত্র এবং ১৯৪৮ সালের নিপীড়ন এবং অন্যান্য অমানবিক শাস্তিসমূহের বিরুদ্ধে চুক্তিপত্র সমূহ অনুমোদন বা রেটিফাই করে এগুলিকে আইনের অন্তর্ভূক্ত করা উচিত। অতএব এই বিষয়ে মাননীয় জেপিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

স্মারকপত্রের পূর্ণপাঠ এখানে দেখুন।

প্রেসবিবৃতি: গত ১৪মার্চ হাইলাকান্দিতে সংঘটিত ধর্ষণ এবং তৎপরবর্তী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিন্দা জানায় বিএইচআরপিসি

March 19, 2018

গত ১৪মার্চ তারিখে হাইলাকান্দি জেলার  বেতছড়া গ্রামে ১৩ বছর বয়সী কিশোরীর ধর্ষণ এবং তৎপরবর্তী খুনের ঘটনাটি নিয়ে বিএইচআরপিসি  তীব্রভাবে শংকিত এবং লজ্জিত। এ ঘটনা আমাদের আরেকবার সমাজের সবচেয়ে জঘন্যতম দিকটির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেখানে দুজন মানুষ শুধু তার লিঙ্গ পরিচয়ের সুবাদে অসমান। শুধুমাত্র লিঙ্গ পরিচয়ের সুবাদে একজন মানুষকে তার জীবন,আত্মসম্মান সব হারাতে হয়। এমতাবস্থায় ভারতীয় দণ্ডবিধি অবশ্য এই অপরাধের সবচেয়ে জঘন্যতম শাস্তির বিধান দিয়ে আমাদেরকে অল্প স্বস্তি দেয়। তাই বিএইচআরপিসি চায় এই ঘটনায় জড়িত অপরাধীর কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি হোক।

তাছাড়া বর্তমান সময়ে জম্মু এবং কাশ্মীরের রাসনা গ্রামের ঘটনাটি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিকতম এই ঘটনাটি নিয়েও যে ধরণের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রবনতা দেখা গেছে বিএইচআরপিসি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এবং প্রশাসনের কাছে এসব কাজে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের আবেদন রাখছে।

Representative photo taken from internet.

Representative photo.

 তবে বিএইচআরপিসি মনে করে ধর্ষণ একটি সামাজিক অপরাধ। ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধী মনস্তত্ত্বের সাথে সাথে আমাদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোও বহুলাংশে দায়ী। সেজন্য প্রত্যেকজন অপরাধীর শাস্তি সুনিশ্চিত করার সাথে সাথে এইসকল অপরাধের চিরনির্মূলীকরণের জন্য বিএইচআরপিসি  আরেকবার ২০১২ সালে জাস্টিস বার্মা কমিটির দেওয়া নিম্নলিখিত  সুপারিশ সমূহ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের আবেদন রাখছে-

১/ ধর্ষণের মামলাসমূহের সহজ নিষ্পত্তির জন্য আলাদাভাবে একটি সুপটু ‘রেইপ  সেল’ বা ‘ধর্ষন প্রকোষ্ঠ’ নির্মাণ করতে হবে। যারা এরকম ঘটনাদি রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং বিনামূল্যে আইনি সাহায্য প্রধানের জন্য সচেষ্ট হবে।

২/ সবকটি থানা এবং জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষকে CCTV ক্যামরার আওতায় আনতে হবে।

৩/ অনলাইলে এফআইআর দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে।

৪/ এসব ঘটনার সাক্ষী এবং সাহায্যকারী দের সাথে অপরাধীদের মতো ব্যবহার করা যাবে না।

৫/ পুলিশবিভাগকে উপযুক্তভাবে লিঙ্গ সংবেদনশীল করে গড়ে তুলতে হবে।

৬/ ধর্ষণের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আইন করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বলে ঘোষণা করতে হবে।

৭/  যৌন শিক্ষাকে শৈক্ষিক পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিএইচআরপিসি এক্ষেত্রে সর্বাঙ্গীণ যৌনশিক্ষা বা Comprehensive Sexuality Education এর প্রচলনের পক্ষে।

৪/  রাজ্য সরকারের যাতে প্রশাসনের উপর প্রতিপত্তি খাটাতে না পারে সেজন্য রাজ্য পুলিশ সুরক্ষা কমিশন বা State Police Security Commission গঠন করতে হবে।

৫/ ২০১৪ সালে ভারতীয় স্বাস্থ্য এবং পরিবার মন্ত্রকের নির্দেশিকা মতে জঘন্য এবং অমানবিক two-finger test এর প্রচলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।